জেলখানার চিঠি – নাজিম হিকমত

নাজিম হিকমতের লেখা জেলখানার চিঠি আধুনিক তুর্কি সাহিত্যের একটি শক্তিশালী ও হৃদয়স্পর্শী কবিতা। কারাগারে বন্দী অবস্থায় লেখা এই কবিতাটি মূলত তার স্ত্রীর উদ্দেশে লেখা এক গভীর আবেগঘন চিঠি, যেখানে ধরা পড়েছে প্রেম, বিচ্ছেদ, যন্ত্রণার পাশাপাশি আশা ও মানবিকতার গভীর আর্তি। কবিতার প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠেছে কারাবন্দি মানুষের নিঃসঙ্গতা ও সমাজ-রাজনীতির নির্মম চিত্র।

হিকমতের ভাষা সোজাসাপ্টা অথচ আবেগময়। তিনি কারাগারের দেয়ালের মধ্যেও মুক্তচিন্তা ও স্বপ্ন দেখার সাহস রাখেন। প্রেমিকের আকুলতা, মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কবিতাকে একটি গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক স্তরে নিয়ে যায়।

‘জেলখানার চিঠি’ শুধুমাত্র একটি প্রেমের কবিতা নয়; এটি নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর এবং কবির আত্মার মুক্তির অভিপ্রকাশ। নাজিম হিকমতের এই কবিতা আজও পাঠকের হৃদয়ে অনুরণিত হয়, কারণ এটি শুধু এক যুগের কথা নয়, সব যুগের নিপীড়িত মানুষের প্রতিধ্বনি।

 

 

জেলখানার চিঠি

প্রিয়তমা আমার
তোমার শেষ চিঠিতে
তুমি লিখেছ ;
মাথা আমার ব্যথায় টন্ টন্ করছে
দিশেহারা আমার হৃদয়।

তুমি লিখেছ ;
যদি ওরা তোমাকে ফাঁসী দেয়
তোমাকে যদি হারাই
আমি বাঁচব না।

তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধু আমার
আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে
তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী,
বিংশ শতাব্দীতে
মানুষের শোকের আয়ূ
বড় জোর এক বছর।

মৃত্যু…
দড়ির এক প্রান্তে দোদুল্যমান শবদেহ
আমার কাম্য নয় সেই মৃত্যু।
কিন্তু প্রিয়তমা আমার, তুমি জেনো
জল্লাদের লোমশ হাত
যদি আমার গলায়
ফাঁসীর দড়ি পরায়
নাজিমের নীল চোখে
ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে ভয়।

অন্তিম ঊষার অস্ফুট আলোয়
আমি দেখব আমার বন্ধুদের, তোমাকে দেখব
আমার সঙ্গে কবরে যাবে
শুধু আমার, এক অসমাপ্ত গানের বেদনা।

 

জেলখানার চিঠি

 

নাজিম হিকমত ঃ

নাজিম হিকমত (জন্ম : ১৫ জানুয়ারি, ১৯০২ – মৃত্যু : ৩ জুন, ১৯৬৩) বিংশ শতাব্দী আবির্ভূত সর্বাগ্রগণ্য একজন তুর্কি ভাষার কবি ও নাট্যকার। উনিশ বৎসর বয়সে তিনি তুরস্কের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন। স্বীয় রাজনৈতিক মতাদর্শের বিড়ম্বনায় তাকে বারবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। তাঁর সারা জীবনের অর্ধেক রচনার প্রসূতিগার কারা অন্তরালের অপরিসর স্থানে ও সময়ের প্রাচুর্য্যে।

তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯০২ সালে এবং মৃত্যু সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৬৩ সালে। কখনো বলা হয়েছে তিনি “রোমান্টিক কমিউনিস্ট”, “জেলখানার কবি”; কখনো বলা হয়েছে তিনি তিনি “রোমান্টিক বিপ্লবী”। কণ্ঠে বিপ্লব ও মুক্তির গান গাইলেও নাজিম হিকমতের কবিতা গীতিময়তায় ঋদ্ধ। নিপীড়ন অধ্যুষিত বিংশ শতাব্দীর বিশ্বে বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর কবিতা।

Leave a Comment