শব্দের স্থাপত্য ও জাদুকরী কণ্ঠ: বাচিকশিল্পী জিয়া মহিউদ্দিন

উপমহাদেশের আবৃত্তি ও বাচিক শিল্পের ইতিহাসে জিয়া মহিউদ্দিন (২০ জুন ১৯৩১ – ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩) একটি অনন্য নাম—একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়। যারা আবৃত্তিকে কেবল আবেগময় কণ্ঠপ্রক্ষেপণ বা কবিতা পাঠের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন, তিনি তাদের সেই ধারণা আমূল বদলে দিয়েছিলেন। তার কাছে আবৃত্তি ছিল “শব্দের স্থাপত্য নির্মাণ”—যেখানে উচ্চারণ, বিরতি, নীরবতা, ছন্দ এবং বোধ মিলেই তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পরূপ।

৭ বছর বয়সে (মেঝেতে, বামে) লাহোরের সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজ ড্রামাটিক ক্লাবের সাথে বাচিকশিল্পী জিয়া মহিউদ্দিন
৭ বছর বয়সে (মেঝেতে, বামে) লাহোরের সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজ ড্রামাটিক ক্লাবের সাথে বাচিকশিল্পী জিয়া মহিউদ্দিন

১৯৩১ সালে জন্ম নেওয়া জিয়া মহিউদ্দিন লন্ডনের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব ড্রামাটিক আর্ট (RADA)-এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ তার কণ্ঠপ্রক্ষেপণ, মঞ্চশৈলী ও অভিনয়বোধকে অসাধারণভাবে শাণিত করে। অভিনেতা হিসেবে তিনি ব্রিটিশ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিচিতি পেলেও দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন মূলত তার আবৃত্তিশৈলী ও জাদুকরী ব্যারিটোন কণ্ঠের জন্য।

জিয়া মহিউদ্দিন

তার কণ্ঠ ছিল গভীর, ভরাট এবং ধ্রুপদী গাম্ভীর্যে পূর্ণ। কিন্তু তার সাফল্যের আসল রহস্য কেবল ঈশ্বরপ্রদত্ত কণ্ঠস্বর নয়; বরং ছিল তার নিখুঁত ডিকশন, শব্দের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিরতির অসাধারণ ব্যবহার। তিনি জানতেন কখন থামতে হবে, কোন শব্দে কতটা জোর দিতে হবে এবং কীভাবে ধীরে ধীরে আবেগের স্তর তৈরি করে শ্রোতাকে কবিতার অন্তরে নিয়ে যেতে হয়। তার আবৃত্তিতে অতিনাটকীয়তা ছিল না; ছিল সংযত আবেগ, মিতব্যয়ী নাটকীয়তা এবং গভীর সাহিত্যবোধ।

জিয়া মহিউদ্দিন

জিয়া মহিউদ্দিন আবৃত্তিশিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিলেন—তিনি গদ্য পাঠ বা প্রোজ রিডিং-কে একটি পূর্ণাঙ্গ পারফর্মিং আর্টে উন্নীত করেন। মুশতাক আহমেদ ইউসুফির রম্যগদ্য তিনি যখন পড়তেন, দর্শক হাসিতে ভেঙে পড়ত; আবার মুহূর্তের মধ্যেই কোনো গম্ভীর সাহিত্য পাঠে তিনি পুরো হলকে নিস্তব্ধ করে দিতে পারতেন। এই বহুমাত্রিক কণ্ঠ-নিয়ন্ত্রণ তাকে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছিল।

জিয়া মহিউদ্দিন

উর্দু কবিতার ক্ষেত্রে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, মির্জা গালিব, নুন মিম রাশেদ কিংবা আহমদ ফারাজের কবিতা তার কণ্ঠে যেন নতুন প্রাণ পেত। বিশেষ করে ফয়েজের “মুঝ সে পহেলি সি মহব্বত” বা “আজ বাজার মে” কবিতাগুলো তার আবৃত্তিতে শ্রোতারা এক নতুন গভীরতায় অনুভব করতেন। বলা হয়ে থাকে—ফয়েজ লিখেছেন, আর জিয়া সেই কবিতাকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন।

জিয়া মহিউদ্দিন

তার আরেকটি বিরল গুণ ছিল ইংরেজি ও উর্দু—এই দুই ভিন্ন ভাষায় সমান দক্ষতা। ইংরেজি পাঠে তিনি ব্রিটিশ থিয়েটারের ধ্রুপদী অভিনেতার মতো শোনাতেন, আবার উর্দু কবিতা পড়লে তার উচ্চারণে দিল্লি ও লখনৌয়ের আভিজাত্য ফুটে উঠত। ভাষার বিশুদ্ধতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। তার বিশ্বাস ছিল—ভুল উচ্চারণে কবিতা পড়া মানে কবির প্রতি অবিচার করা।

জিয়া মহিউদ্দিন

মঞ্চে তার উপস্থিতিও ছিল স্বতন্ত্র। সাধারণত একটি রিডিং ল্যাম্প, হাতে বই, আর সংযত ভঙ্গি—এই সামান্য আয়োজনেই তিনি শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন। লাহোর ও করাচিতে অনুষ্ঠিত তার বার্ষিক “জিয়া মহিউদ্দিন শো” সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল, যেখানে মানুষ কেবল তার কণ্ঠ শুনতেই ভিড় করত।

জিয়া মহিউদ্দিন

শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, সাংস্কৃতিক শিক্ষায়ও তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তরুণ শিল্পীদের উচ্চারণ, ভাষা ও বাচিক শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন—আবৃত্তি মানে কেবল আবেগ নয়; এটি মেধা, মনন ও কণ্ঠের সুষম সমন্বয়।

জিয়া মহিউদ্দিন

২০২৩ সালে তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে আবৃত্তিশিল্পের এক স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে। কিন্তু তার রেখে যাওয়া অসংখ্য অডিও রেকর্ডিং, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং প্রশিক্ষিত শিল্পীরা আজও তার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। জিয়া মহিউদ্দিন প্রমাণ করে গেছেন—একটি কণ্ঠও ইতিহাসের ধারক হতে পারে, সংস্কৃতির বাহক হতে পারে এবং শব্দকে অমর করে রাখতে পারে। তিনি কেবল একজন আবৃত্তিশিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন শব্দের স্থপতি, ভাষার রক্ষক এবং বাচিক শিল্পের এক চিরন্তন মানদণ্ড।

জিয়া মহিউদ্দিন

আজ জিয়া মহিউদ্দিনের জন্মদিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাকে স্মরণ করি—একজন শিল্পী হিসেবে যিনি আমাদের শিখিয়েছেন শব্দ কীভাবে কণ্ঠে প্রাণ পায়, বিরতি কীভাবে অর্থ সৃষ্টি করে, আর আবৃত্তি কীভাবে এক পূর্ণাঙ্গ শিল্পে রূপ নেয়। তার কণ্ঠ হয়তো আজ নীরব, কিন্তু তার নির্মিত বাচিক ঐতিহ্য, তার শৈলী এবং তার রেখে যাওয়া অমূল্য রেকর্ডিং আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখিয়ে যাবে দীর্ঘদিন।

Leave a Comment