নির্মলেন্দু গুণের “আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি” একটি ঐতিহাসিক ও আবেগময় কবিতা, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করে। এই কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যাঁর নেতৃত্ব, সাহস এবং স্বপ্ন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি।
কবিতাটিতে বঙ্গবন্ধুর এক ঐতিহাসিক ভাষণের পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। গুণ কাব্যিকভাবে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি, ভাষণ দেওয়ার ভঙ্গি ও চেতনার বর্ণনা দেন। “আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি” – এই লাইনটি কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, যা বঙ্গবন্ধুর শান্তিপূর্ণ মনোভাব ও প্রজ্ঞাকে প্রকাশ করে।
এই কবিতা শুধু একজন নেতার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের ইতিহাসও। নির্মলেন্দু গুণ তাঁর কাব্যভাষায় বঙ্গবন্ধুর মহত্ব, দূরদর্শিতা ও আবেগকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা পাঠকের মনে গভীর অনুরণন সৃষ্টি করে। এটি বাংলা সাহিত্যের এক মূল্যবান কবিতা এবং জাতির স্মৃতিতে গাঁথা এক অনন্য দলিল।

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি
সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
শহিদ মিনার থেকে খসে-পড়া একটি রক্তাক্ত ইট গতকাল আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
সমবেত সকলের মতো আমিও পলাশ ফুল খুব ভালোবাসি, ‘সমকাল’
পার হয়ে যেতে সদ্যফোটা একটি পলাশ গতকাল কানে কানে
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
শাহবাগ এ্যভিন্যুর ঘূর্ণায়িত জলের ঝরনাটি আর্তস্বরে আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
সমবেত সকলের মতো আমারো স্বপ্নের প্রতি পক্ষপাত আছে,
ভালোবাসা আছে_ শেষ রাতে দেখা একটি সাহসী স্বপ্ন গতকাল
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,
না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জরীগুলো কান পেতে শুনুক,
আসন্ন সন্ধ্যার এই কালো কোকিলটি জেনে যাক_
আমার পায়ের তলায় পুণ্য মাটি ছুঁয়ে
আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আজ সেই পলাশের কথা
রাখলাম, আজ সেই স্বপ্নের কথা রাখলাম।
আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।
