স্বপ্নের হাতে – জীবনানন্দ দাশ

জীবনানন্দ দাশের গভীর জীবনদর্শন ও পরাবাস্তববাদী চেতনার এক অনন্য ফসল ‘স্বপ্নের হাতে’ কবিতাটি। এটি কবির দ্বিতীয় এবং অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’-র অন্তর্ভুক্ত, যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৬ সালে (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)। আধুনিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, সংঘাত আর শরীরের ব্যাঘাতে যখন মানুষের হৃদয়ে বেদনার স্তূপ জমে ওঠে, তখন কবি এক অবিনশ্বর আশ্রয়ের পথ দেখান—আর তা হলো ‘স্বপ্ন’। এই কবিতায় স্বপ্ন কেবল অলীক কল্পনা নয়, বরং এক পরম সত্যের জগত যেখানে পৃথিবীর সকল ব্যর্থতা আর অস্পষ্ট অক্ষরগুলো মুক্তি খুঁজে পায়। ১৯৩০-এর দশকের উত্তাল সময়ে যখন আধুনিক মানুষের মনে অবক্ষয় আর যান্ত্রিকতা গ্রাস করছিল, তখন জীবনানন্দ এই কবিতার মাধ্যমে স্বপ্ন ও ধ্যানের এক চিরন্তন জগতের আহ্বান জানিয়েছেন। নক্ষত্রের আলো বা মানুষের আয়ু শেষ হয়ে গেলেও এই স্বপ্নের জগত কেন অক্ষয় হয়ে রয়, কবি এখানে তারই এক মায়াবী ও গীতিময় আখ্যান তৈরি করেছেন।

 

স্বপ্নের হাতে – জীবনানন্দ দাশ

পৃথিবীর বাধা— এই দেহের ব্যাঘাতে
হৃদয়ে বেদনা জমে; স্বপনের হাতে
আমি তাই
আমারে তুলিয়া দিতে চাই।
যেই সব ছায়া এসে পড়ে
দিনের রাতের ঢেউয়ে— তাহাদের তরে
জেগে আছে আমার জীবন;
সব ছেড়ে আমাদের মন
ধরা দিতো যদি এই স্বপনের হাতে
পৃথিবীর রাত আর দিনের আঘাতে
বেদনা পেত না তবে কেউ আর—
থাকিত না হৃদয়ের জরা—
সবাই স্বপ্নের হাতে দিতো যদি ধরা।

আকাশ ছায়ার ঢেউয়ে ঢেকে,
সারা দিন— সারা রাত্রি অপেক্ষায় থেকে,
পৃথিবীর যত ব্যথা— বিরোধ— বাস্তব
হৃদয় ভুলিয়া যায় সব;
চাহিয়াছে অন্তর যে-ভাষা,
যেই ইচ্ছা— যেই ভালোবাসা
খুঁজিয়াছে পৃথিবীর পারে-পারে গিয়া—
স্বপ্নে তাহা সত্য হ’য়ে উঠেছে ফলিয়া।
মরমের যত তৃষ্ণা আছে—
তারি খোঁজে ছায়া আর স্বপনের কাছে
তোমরা চলিয়া এসো—
তোমরা চলিয়া এসো সব!
ভুলে যাও পৃথিবীর ওই ব্যথা— ব্যাঘাত— বাস্তব!
সকল সময়

স্বপ্ন— শুধু স্বপ্ন জন্ম লয়
যাদের অন্তরে,
পরস্পরে যারা হাত ধরে
নিরালা ঢেউয়ের পাশে-পাশে—
গোধূলির অস্পষ্ট আকাশে
যাহাদের আকাঙ্ক্ষার জন্ম— মৃত্যু— সব—
পৃথিবীর দিন আর রাত্রির রব
শোনে না তাহারা;
সন্ধ্যার নদীর জল— পাথরে জলের ধারা
আয়নার মতো
জাগিয়া উঠিছে ইতস্তত
তাহাদের তরে।
তাদের অন্তরে
স্বপ্ন, শুধু স্বপ্ন জন্ম লয়
সকল সময় …

পৃথিবীর দেয়ালের ’পরে
আঁকাবাঁকা অসংখ্য অক্ষরে
একবার লিখিয়াছি অন্তরের কথা—
সে-সব ব্যর্থতা
আলো আর অন্ধকারে গিয়াছে মুছিয়া;
দিনের উজ্জ্বল পথ ছেড়ে দিয়ে
ধূসর স্বপ্নের দেশে গিয়া
হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষার নদী
ঢেউ তুলে তৃপ্তি পায়— ঢেউ তুলে তৃপ্তি পায় যদি,
তবে ওই পৃথিবীর দেয়ালের ’পরে
লিখিতে ষেও না তুমি অস্পষ্ট অক্ষরে
অন্তরের কথা;
আলো আর অন্ধকারে মুছে যায় সে-সব ব্যর্থতা।

পৃথিবীর ওই অধীরতা
থেমে যায়— আমাদের হৃদয়ের ব্যথা
দূরের ধুলোর পথ ছেড়ে
স্বপ্নেরে— ধ্যানেরে
কাছে ডেকে লয়;
উজ্জ্বল আলোর দিন নিভে যায়,
মানুষেরো আয়ু শেষ হয়।
পৃথিবীর পুরানো সে-পথ
মুছে ফেলে রেখা তার—
কিন্তু এই স্বপ্নের জগৎ
চিরদিন রয়!
সময়ের হাত এসে মুছে ফেলে আর সব—
নক্ষত্রেরো আয়ু শেষ হয়!

 

আবৃত্তির জন্য ছোট একটি পরামর্শ:

এই কবিতাটি পাঠের সময় একটি ‘পরাবাস্তব’ (Surreal) আবহ তৈরি করা প্রয়োজন। শুরুটা কিছুটা ক্লান্তিতে হলেও ‘তোমরা চলিয়া এসো সব’ অংশটি থেকে কণ্ঠের মধ্যে এক ধরণের উদাত্ত আহ্বান থাকতে হবে। শেষের দিকে ‘চিরদিন রয়!’ পঙ্‌ক্তিটিতে গভীর প্রত্যয় ফুটিয়ে তুললে আবৃত্তিটি পূর্ণতা পাবে।

Leave a Comment