আঁসু – জাভেদ আখতার (বাংলা হরফে ও বাংলা অনুবাদ)

জাভেদ আখতারের “আঁসু” একটি গভীর আত্মঅনুসন্ধানী কবিতা, যেখানে মানবিক অনুভূতির রহস্য এবং সহমর্মিতার গোপন উৎস অনুসন্ধান করা হয়েছে। প্রথম পাঠে কবিতাটি যেন একটি সাধারণ প্রতিক্রিয়ার কথা বলে—বন্ধুর দুঃখের কথা শুনে চোখে জল এসে যাওয়া। কিন্তু ধীরে ধীরে কবি প্রকাশ করেন, এই অশ্রু তখনই জন্মায় না; তা বহু আগেই জন্ম নিয়েছিল, হৃদয় আর চোখের মাঝখানে কোথাও সঞ্চিত হয়ে ছিল—স্মৃতি, হতাশা আর চাপা পড়ে থাকা বেদনার এক ছায়াময় অন্তর্জগতে।

একটি মাত্র অশ্রুকে কবি রূপ দেন অনুভূতির উত্তরাধিকার হিসেবে। এর ভেতরে জমে থাকে উচ্চারিত না-হওয়া কষ্ট, ভুলে যাওয়া ক্ষত আর দমিয়ে রাখা সহানুভূতির ভার। আখতার ইঙ্গিত দেন, সংবেদনশীলতা কোনো একক ঘটনার ফল নয়; অসংখ্য অদৃশ্য অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। সেই অশ্রু ‘অভিভাবকহীন’, কারণ যার যন্ত্রণায় তার জন্ম, সে যন্ত্রণা অনেক আগেই মরে গেছে—ফলে অশ্রুটির আর কোনো স্পষ্ট কারণ বা মালিক নেই। তবু সে অর্থ ও মুক্তির খোঁজে থাকে।

অন্য কারও দুঃখের গল্প সামনে এলে, সেই অশ্রু অবশেষে নিজের অস্তিত্বের কারণ খুঁজে পায়। সে সেই বেদনাকে আশ্রয় করে বাইরে আসার পথ খুঁজে নেয়। এই মুহূর্তে ব্যক্তিগত শোক যৌথ হয়ে ওঠে, আর সহমর্মিতা দৃশ্যমান রূপ পায়।

সহজ ভাষা ও শক্তিশালী রূপকের মাধ্যমে “আঁসু” একটি অশ্রুকে রূপ দেয় মানবিক সংযোগ, আবেগের স্মৃতি এবং একে অপরের কষ্ট নীরবে বহন করে চলার এক গভীর কাব্যিক প্রতিফলনে।

আঁসু (বাংলা হরফে) – জাভেদ আখতার

কিসী কা গ়ম সুন কে
মেরী পালকোঁ পে

এক আঁসু জো আ গয়া হ্যায়
য়ে আঁসু ক্যা হ্যায়

য়ে আঁসু ক্যা এক গওয়াহ হ্যায়
মেরী দরদ-মন্দী কা, মেরী ইনসান-দোস্তী কা

য়ে আঁসু ক্যা এক সুবূত হ্যায়
মেরী জিন্দেগী মে খুলূস কী এক রৌশনী কা

য়ে আঁসু ক্যা ইয়ে বতা রহা হ্যায়
কি মেরে সীনে মে এক হাস্সাস দিল হ্যায়

জিস নে কিসী কী দিল-দোজ় দাস্তাঁ জো সুনী
তো সুন কে তড়প উঠা হ্যায়

পরায়ে শোলোঁ মে জল রহা হ্যায়
পিঘল রহা হ্যায়

মগর মেঁ ফির খুদ সে পুছতা হুঁ
য়ে দাস্তাঁ তো অভী সুনী হ্যায়

য়ে আঁসু ভী ক্যা অভী ঢলা হ্যায়
য়ে আঁসু

ক্যা মেঁ ইয়ে সমঝুঁ
পহলে কহীঁ নহীঁ থা

মুঝে তো শক হ্যায় কি ইয়ে কহীঁ থা
য়ে মেরে দিল ঔর মেরী পালকোঁ কে দরমিয়াঁ

এক জো ফাসলা হ্যায়
জহাঁ খেয়ালোঁ কে শহর জিন্দা হ্যায়

ঔর খ্বাবোঁ কী তুরবতে হ্যায়
জহাঁ মহব্বত কে উজ়ড়ে বাগোঁ মে

তলখিয়োঁ কে বাবূল হ্যায়
ঔর কুছ নহীঁ হ্যায়

জহাঁ সে আগে হ্যায়
উলঝনোঁ কে ঘনেরে জঙ্গল

য়ে আঁসু
শায়দ বহুত দিনোঁ সে

ওহীঁ ছুপা থা
জিন্নোঁ নে ইস কো জনম দিয়া থা

ও রঞ্জ তো মসলাহাত কে হাতোঁ
না জানে কবে ক়ত্ল হো গয়ে থে

তো করতা ফির কিস পে নাজ আঁসু
কি হো গয়া বেজওয়াজ আঁসু

ইয়াতীম আঁসু, ইয়াসীর আঁসু
না মো’তাবর থা

না রাসতোঁ সে হী বা-খবর থা
তো চলতে চলতে

ও থম গয়া থা
ঠিঠক গয়া থা

ঝিঝক গয়া থা
ইধর সে আজ এক কিসী কে গ়ম কী

কহানী কা কারভাঁ জো গুজ়রা
ইয়াতীম আঁসু নে জাইসে জানা

কি ইস কহানী কী সরপরস্তী মিলে
তো মুমকিন হ্যায়

রাহ পানা
তো এক কহানী কী উংলী থামে

উসী কে গ়ম কো রুমাল করতা
ইসী কে বারে মে

ঝূঠে সচ্চে সওয়াল করতা
য়ে মেরী পালকোঁ তাক আ গয়া হ্যায়

জাভেদ আখতারের ‘আঁসু’ বাংলা অনুবাদ

কারও দুঃখের কথা শুনে
আমার চোখের পাতায়
যে একটি অশ্রু এসে পড়েছে—

এই অশ্রুটা কী?

এ কি আমার বেদনাবোধের সাক্ষী,
আমার মানবপ্রেমের প্রমাণ?
এ কি আমার জীবনে খাঁটি অনুভূতির
একটি আলোর চিহ্ন?

এ কি জানিয়ে দিচ্ছে
আমার বুকের ভেতর একটি সংবেদনশীল হৃদয় আছে—
যে কারও হৃদয়-ছিন্ন করা কাহিনি শুনে
অস্থির হয়ে ওঠে,
পরের আগুনে নিজেও জ্বলে,
গলে যায় নীরবে?

তবু আমি আবার নিজেকেই প্রশ্ন করি—
এই কাহিনি তো এইমাত্র শুনলাম,
তাহলে এই অশ্রু কি এইমাত্র জন্ম নিল?

এই অশ্রু…
আমি কি বিশ্বাস করব
এ আগে কোথাও ছিল না?

আমার তো সন্দেহ হয়,
এ আগে থেকেই কোথাও ছিল—
আমার হৃদয় আর চোখের পাতার মাঝখানে
যে এক অদ্ভুত দূরত্ব,
সেখানে—

যেখানে চিন্তার শহরগুলো বেঁচে থাকে,
আর স্বপ্নদের কবর ছড়িয়ে থাকে,
যেখানে ভালোবাসার উজাড় বাগানে
তিতকুটে বাবলা ছাড়া কিছু নেই,
আর তারও পরে
জটিলতার ঘন অরণ্য।

এই অশ্রু
হয়তো বহুদিন ধরেই
সেখানেই লুকিয়ে ছিল।

যে দুঃখ একদিন একে জন্ম দিয়েছিল,
সে দুঃখ তো বিবেচনার হাতে
কবে যে খুন হয়ে গেছে!

তাহলে অশ্রু কিসের গর্ব করবে?
কারণহীন হয়ে পড়া এই অশ্রু—
এ যেন এক অনাথ অশ্রু,
এক বন্দি অশ্রু,
যার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই,
পথঘাটের খবরও নেই।

হাঁটতে হাঁটতে সে থেমে গিয়েছিল,
দ্বিধায় পড়েছিল,
সংকোচে জমে গিয়েছিল।

ঠিক তখনই আজ
কারও দুঃখের গল্পের এক কাফেলা
পাশ দিয়ে চলে গেল।

অনাথ অশ্রুটি যেন বুঝে গেল—
এই গল্পের আশ্রয় পেলে
হয়তো তার পথ পাওয়া সম্ভব।

তাই সে এক গল্পের আঙুল ধরে
তারই দুঃখকে রুমালের মতো মুছতে মুছতে,
সেই দুঃখকে ঘিরেই
সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন তুলতে তুলতে
অবশেষে
আমার চোখের পাতায় এসে পৌঁছাল।

Leave a Comment