জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী কবিতা ‘কুড়ি বছর পরে’ কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ (১৯৩৬)-এর অন্যতম একটি জনপ্রিয় সৃষ্টি। দীর্ঘ দুই দশকের ব্যবধানে কোনো এক পুরোনো প্রিয় মানুষের সাথে পুনরায় দেখা হওয়ার আকুতি এবং সময়ের অমোঘ বিবর্তন এই কবিতার মূল উপজীব্য। আবৃত্তিকারদের জন্য এই কবিতাটি পাঠের সময় একটি ধীর গতির লয় (Tempo) বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি; বিশেষ করে ‘কুড়ি-কুড়ি বছরের পার’ বলার সময় দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের যে ক্লান্তি, তা কণ্ঠে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে। কবিতায় ব্যবহৃত ‘হলুদ নদী’, ‘শিরীষের ডালপালা’ কিংবা ‘পেঁচার হামাগুড়ি’—এই প্রতিটি চিত্রকল্পকে আবৃত্তির স্বরক্ষেপণের মাধ্যমে শ্রোতার চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলতে হয়, যাতে সময়ের ধূসরতা আর প্রকৃতির মায়াবী রূপ একাকার হয়ে ধরা দেয়।
কুড়ি বছর পরে — জীবনানন্দ দাশ
আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!
আবার বছর কুড়ি পরে—
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে—
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে— তখন হলুদ নদী
নরম-নরম হয় শর কাশ হোগলায়— মাঠের ভিতরে।
অথবা নাইকো ধান খেতে আর;
ব্যস্ততা নাইকো আর,
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়
পাখির নীড়ের থেকে খড়
ছড়াতেছে; মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর শিশিরের জল—
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার—
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!
হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে
সরু-সরু কালো-কালো ডালপালা মুখে নিয়ে তার,
শিরীষের অথবা জামের,
ঝাউয়ের— আমের;
কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে!
জীবন গিয়েছে চ’লে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার—
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!
তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে—
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশথের জানালার ফাঁকে
কোথায় লুকায় আপনাকে!
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে—
সোনালি-সোনালি চিল— শিশির শিকার ক’রে নিয়ে গেছে তারে—
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!