“নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অনন্য সৃষ্টি, যা তাঁর কাব্যজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি ১৩০৭ বঙ্গাব্দে (১৯০০ খ্রিস্টাব্দে) প্রকাশিত হয় এবং অনেকেই মনে করেন, এই কবিতার মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথের আধুনিক কাব্যধারার সূচনা ঘটে।
এই কবিতায় কবি নিজের ভিতরকার শক্তির জাগরণ, এক গভীর আত্ম-উপলব্ধি ও কবিত্বের বোধের উন্মেষ প্রকাশ করেছেন। কবিতার প্রতিটি চরণ যেন একটি অভ্যন্তরীণ ঝড়ের ফল, যেখানে ঘুমন্ত এক আত্মার মধ্যে সৃষ্টি হয় এক নবজাগরণ। শব্দচয়ন, ছন্দ এবং আবেগময় প্রকাশের মধ্য দিয়ে কবি যেন তাঁর হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসা একটি দীপ্ত ঘোষণা করেছেন—”আমি জেগে উঠিয়াছি”।
এই কবিতা শুধু ব্যক্তিগত আত্মদর্শনের নয়, বরং জাতির চেতনার সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। এটি আমাদের দেখায় কীভাবে শিল্প ও সৃষ্টিশীলতা এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ফোটে ওঠে। “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” তাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল ও যুগান্তকারী কবিতা।

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ
আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।
থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,
শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,
ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল
গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।
হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়
ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায় –
বাহিরেতে চায়, দেখিতে না পায় কোথায় কারার দ্বার।
কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,
চারি দিকে তার বাঁধন কেন!
ভাঙ্ রে হৃদয়, ভাঙ্ রে বাঁধন,
সাধ্ রে আজিকে প্রাণের সাধন,
লহরীর পরে লহরী তুলিয়া
আঘাতের পরে আঘাত কর্।
মাতিয়া যখন উঠেছে পরান
কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!
উথলি যখন উঠেছে বাসনা
জগতে তখন কিসের ডর!
আমি ঢালিব করুণাধারা,
আমি ভাঙিব পাষাণকারা,
আমি জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া
আকুল পাগল-পারা।
কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া,
রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া,
রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া দিব রে পরান ঢালি।
শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,
ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব,
হেসে খলখল গেয়ে কলকল তালে তালে দিব তালি।
এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে মোর,
এত সুখ আছে, এত সাধ আছে – প্রাণ হয়ে আছে ভোর।।
কী জানি কী হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ –
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
ওরে, চারি দিকে মোর
এ কী কারাগার ঘোর –
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্।
ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি,
এসেছে রবির কর।
