আবৃত্তির জন্য ‘বনলতা সেন’ একটি ধ্রুপদী নির্বাচন। বিশ শতকের তিরিশের দশকে বাংলা কবিতার বাঁক বদলের এক নির্জন কারিগর—জীবনানন্দ দাশ। তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘বনলতা সেন’ কেবল একটি কবিতা নয়, বরং হাজার বছরের ক্লান্তি আর একমুঠো শান্তির এক মহাকাব্যিক আখ্যান।
কবিতাটি প্রথম রচিত হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকে। এরপর ১৯৩৫ সালে (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় এটি প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ১৯৪২ সালে কবির নিজস্ব কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা সেন’-এ এটি গ্রন্থভুক্ত হয়।
ইতিহাসের ধূসর পাণ্ডুলিপি থেকে বিম্বিসার-অশোকের জগত পেরিয়ে কবি যখন আধুনিক নগরের যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত, তখন নাটোরের বনলতা সেন তাঁর কাছে আবির্ভূত হন এক পরম আশ্রয় হয়ে। পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে যে শাশ্বত অন্ধকারের মুখোমুখি আমরা বসি, সেই নির্জনতারই এক সার্থক শিল্পরূপ এই কবিতা।
আসুন শোনা যাক, জীবনানন্দ দাশের সেই কালজয়ী সৃষ্টি—‘বনলতা সেন’।
বনলতা সেন — জীবনানন্দ দাশ
হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।