মাধবীর জন্যে – পূর্ণেন্দু পত্রী

পূর্ণেন্দু পত্রীর কালজয়ী কবিতা ‘মাধবীর জন্যে’ তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘কথোপকথন’-এর অন্তর্ভুক্ত, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে। এটি বাংলা সাহিত্যে ‘দৃশ্যধর্মী’ বা ‘সিনেম্যাটিক’ কবিতার এক অনন্য উদাহরণ। কবিতার শরীরজুড়ে রয়েছে চলচ্চিত্রের শ্যুটিংয়ের আবহ—যেখানে মেক-আপ, ক্লোজআপ আর লাইটসের সঙ্কেতে এক বিষাদময় প্রেম ও বিরহ ফুটে ওঠে। প্রখ্যাত সমালোচক ও আবৃত্তিকারদের মতে, এই কবিতায় ‘ব্রেখশীয় ডিসট্যান্স’ বা মোহভঙ্গের কৌশল সুনিপুণভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। সহজ সংলাপ আর গভীর চিত্রকল্পের সমন্বয়ে রচিত এই কবিতাটি আধুনিক নাগরিক জীবনের এক চিরকালীন ক্লাসিক, যা আজও কবিতা-প্রেমীদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

মাধবীর জন্যে — পূর্ণেন্দু পত্রী

 

আয়নার পাশে একটু অন্ধকার ছায়া এঁকে দাও।

ব্যথিত দৃশ্যের পট জুড়ে থাক স্তিমিত আঁধার।

দেয়ালের ছবিটাকে একটু সরাতে হবে ভাই।

ওটা নয়, এই ছবিটাকে।

জুলিয়েট জ্যোৎস্নার ভিতরে

রক্তে উচ্চকিত তৃষ্ণা রোমিওর উষ্ণ ওষ্ঠাধরে।

ব্যাস, ব্যাস।

লাইটস বার্নিং।

মাধবী, আসুন।

একটা ক্লোজআপ নেব।

এখানে দাঁড়ান, একটু বাঁ দিক ঘেঁষে প্লিজ।

মনিটর…

মাধবী বলুন—

কিছু লাভ আছে মনে রেখে?

না। অত স্পষ্ট নয়।

আরেকটু নির্জন স্বরে

নিজের আত্মার সঙ্গে কথোপকথন।

যেন মনে হয়

ওষ্ঠ হতে উচ্চারিত কয়েকটি শীতল বাক্য নয়।

মনে হবে সন্ধ্যাবেলা সারা ধরাতলে

অবসন্ন কুসুম ঝরিছে বনবীথিতলে নীরব রোদনে।

মনে হবে নীরব রোদনে

যেন আপনি বলতে চান

মনে রেখো, মনে রেখো সখা,

যেন কেহ কোনোদিন মনে রাখে নাই

মনে আর রাখিবে না।

জ্যোৎস্নার ভিতরে কোথাও আহ্বান নেই আর,

উষ্ণ ওষ্ঠাধর দুটি গোলাপের মহিমায় ফুটে

এখন অপেক্ষমাণ

কবে পাখি বলে যাবে, রাত্রি হলো অবসান।

দৃষ্টি আরও নত হবে

সম্মুখে কোথাও কোনো দেখিবার মতো দৃশ্য নাই।

নিবন্ত ধূপের সাদা ছাই

রজনী পোয়ানো কিছু মৃত গোলাপের দীর্ঘশ্বাস

হাঁ-করা নেকড়ের মুখে দগ্ধ সিগারেট

এইটুকু দৃশ্য শুধু পড়ে আছে কাঠের টেবিলে।

লাইটস বার্নিং।

মাধবী, মেক-আপ, আলো,

এবার টেকিং—

মাধবী, নিশ্চয় মনে আছে সংক্ষিপ্ত সংলাপটুকু

কিছু লাভ আছে মনে রেখে?

Leave a Comment