আবৃত্তি শেখার নিয়ম পর্ব ২ : শুদ্ধ উচ্চারণ ও আঞ্চলিকতা মুক্তির উপায়

আগের পর্বে আমরা আবৃত্তির ভূমিকা এবং বাচিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা জেনেছি যে, আবৃত্তি একটি নিঃসঙ্গ কণ্ঠের সাধনা। এই সাধনার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো শুদ্ধ উচ্চারণ

আগের পর্ব দেখতে চাইলে দেখুন : আবৃত্তি শেখার নিয়ম পর্ব ১ : আবৃত্তির ভূমিকা ও মনস্তত্ত্ব

একজন আবৃত্তি শিল্পীর প্রথম এবং সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাঁর প্রমিত (Standard) এবং স্পষ্ট উচ্চারণ। আপনি কবিতাটি যত গভীর আবেগ দিয়েই পড়ুন না কেন, যদি আপনার উচ্চারণ অশুদ্ধ হয় বা তাতে আঞ্চলিকতার টান থাকে, তবে তা শ্রোতার কানে শ্রুতিমধুর হবে না। আবেগ হলো আবৃত্তির ‘প্রাণ’, কিন্তু উচ্চারণ হলো তার ‘শরীর’। শরীরের গঠন যদি ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে প্রাণ সেখানে ঠিকমতো বসতে পারে না। প্রমিত বাংলা উচ্চারণ কেবল ব্যাকরণগত নিয়ম নয়, এটি একটি শৈল্পিক দক্ষতা, যা নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হয়। আজকের পর্বে আমরা শব্দের এই কারিগরি দিকগুলো বিস্তারিত জানব।

১. আঞ্চলিকতা পরিহার: কেন এবং কীভাবে?

আমাদের সবারই একটি জন্মগত আঞ্চলিক ভাষা বা ‘উপভাষা’ (Dialect) থাকে। মায়ের মুখের এই ভাষা ঘরোয়া পরিবেশে অমূল্য এবং আবেগের চূড়ান্ত বাহক। কিন্তু আবৃত্তির মঞ্চ হলো একটি সর্বজনীন স্থান, যেখানে বাংলাদেশের বা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের বাংলাভাষী মানুষ যেন আপনার প্রতিটি শব্দ বুঝতে পারেন। এজন্য আঞ্চলিকতা পরিহার করা অপরিহার্য।

  • আঞ্চলিক টান বা সুর (Intonation): অনেক সময় আবৃত্তিকার শব্দের উচ্চারণ ঠিকঠাক করলেও বাক্যের শেষে বা মাঝখানে অবচেতনভাবেই নিজের অঞ্চলের সুর বা টান নিয়ে আসেন। একে ইংরেজিতে ‘Accent’ বা ‘Intonation’ বলে। এটি কবিতার মেজাজ নষ্ট করে দেয়।
  • কীভাবে দূর করবেন?
    • সচেতনতা: প্রথম ধাপ হলো নিজের ভুল সম্পর্কে সচেতন হওয়া। কথা বলার সময় প্রতিটি শব্দের ওপর এবং বাক্যের সুরের ওপর সচেতনভাবে নজর দিন।
    • পর্যবেক্ষণ: প্রমিত ভাষায় সংবাদ পাঠ (যেমন আকাশবাণী বা বাংলাদেশ বেতারের পুরনো সংবাদ) অথবা গুণী আবৃত্তিকারদের কথা বলা গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুন। তাঁরা কীভাবে বাক্যের শেষে স্বর নামান বা চড়ান, তা অনুকরণ করার চেষ্টা করুন।
    • দৈনন্দিন চর্চা: আবৃত্তি চর্চার বাইরেও বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বা ফোনে কথা বলার সময় শুদ্ধ প্রমিত রূপটি ব্যবহারের চেষ্টা করুন। এটি আপনার জন্য প্রমিত ভাষাকে স্বাভাবিক (Natural) করে তুলবে।

 

২. বর্ণ চর্চা: গোঁড়ার ভুল সংশোধন

স্কুল জীবন থেকে আমাদের অনেকেরই কিছু বর্ণ উচ্চারণে জড়তা বা ভুল মজ্জাগত হয়ে যায়। আবৃত্তিকার হিসেবে আপনাকে এই বর্ণগুলো নতুন করে চিনতে হবে এবং এদের সঠিক উচ্চারণ স্থান আয়ত্ত করতে হবে।

ক) ‘অ’ বর্ণের কারসাজি (Phonetics of ‘O’):

বাংলায় ‘অ’ বর্ণটি সবচেয়ে রহস্যময়। এটি দুইভাবে উচ্চারিত হয়:

  • সংবৃত (ও-এর মতো): যখন ‘অ’-এর উচ্চারণ ‘ও’ কারের মতো হয়। যেমন— ‘অতি’ (উচ্চারণ হবে ওতি), ‘মন’ (উচ্চারণ হবে মোন্), ‘নদী’ (উচ্চারণ হবে নোদী)। সাধারণত শব্দের শেষে ‘ই’ বা ‘উ’ কার থাকলে আগের ‘অ’ সংবৃত হয়।
  • বিবৃত (স্বাভাবিক অ): যখন ‘অ’-এর উচ্চারণ স্বাভাবিক থাকে। যেমন— ‘অমল’, ‘কথা’, ‘গগন’। আবৃত্তির পাণ্ডুলিপি তৈরির সময় এই পার্থক্যটি বুঝে উচ্চারণ লিখে নেওয়া উচিত।

খ) ‘এ’ বর্ণের রহস্য (Phonetics of ‘E’):

‘এ’ বর্ণটিও দুইভাবে উচ্চারিত হয়, যা অনেকে খেয়াল করেন না:

  • সংবৃত (স্বাভাবিক এ): যেমন— ‘মেঘ’, ‘খেলা’, ‘শেষ’। এখানে ‘এ’ কারের উচ্চারণ স্বাভাবিক।
  • বিবৃত (অ্যা-এর মতো): যেমন— ‘দেখা’ (উচ্চারণ হবে দ‍্যাখা), ‘এক’ (উচ্চারণ হবে অ্যাক), ‘খেলা’ (যখন ‘খেলা করা’ অর্থে—খ‍্যালা)। কবিতার ভাবের সাথে এই দুই উচ্চারণের সঠিক প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গ) শ, ষ, স-এর বিভ্রাট:

বাংলায় এই তিনটি বর্ণ থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদের উচ্চারণ তালব্য ‘শ’-এর মতো হয় (যেমন: ‘শহর’, ‘ষড়যন্ত্র’, ‘সকাল’)। তবে একটি বিশেষ নিয়ম আছে: ন, ত, থ, র, ল—এই বর্ণগুলোর সাথে যুক্ত হলে ‘স’ তার নিজস্ব দন্ত্য-রূপ (ইংরেজির S-এর মতো) পায়। যেমন: ‘স্নান’, ‘রাস্তা’, ‘অস্থি’। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি আবৃত্তিকে অত্যন্ত মার্জিত করে তোলে।

৩. ব্যঞ্জনবর্ণের সঠিক অবস্থান

ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণেও কিছু সাধারণ ভুল আমরা প্রায়শই করি, যা শুধরে নেওয়া প্রয়োজন:

  • ন এবং ণ: লিখিত রূপ ভিন্ন হলেও আধুনিক প্রমিত বাংলা আবৃত্তিতে দন্ত্য-ন এবং মূর্ধন্য-ণ এর উচ্চারণে কোনো পার্থক্য নেই। দুটিই দন্ত্য-ন এর মতো অর্থাৎ জিহ্বার ডগা দাঁতের গোড়ায় লাগিয়ে উচ্চারিত হয়।

  • র এবং ড়: এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ভুলের জায়গা। ‘বাড়ি’ (বাসস্থান) আর ‘বারি’ (জল)-এর পার্থক্য কেবল জিহ্বার সামান্য নাড়াচাড়ায়। ‘র’ উচ্চারণে জিহ্বা কাঁপে, কিন্তু ‘ড়’ উচ্চারণে জিহ্বার তলা দিয়ে তালুতে একটা দ্রুত টোকা দিতে হয়। এই টোকাটি আবৃত্তিকে ধারালো এবং স্পষ্ট করে তোলে।

৪. যুক্তবর্ণের সঠিক রূপ ও গাম্ভীর্য

যুক্তবর্ণ অনেক সময় শব্দের গাম্ভীর্য এবং ওজন বাড়িয়ে দেয়। এদের ভুল উচ্চারণ কবিতার অর্থই পাল্টে দিতে পারে।

  • উদাহরণ: ‘ক্ষ’ (ক্+ষ): এর উচ্চারণ অনেকটা ‘খ’-এর মতো মনে হলেও শব্দের শুরুতে এটি ‘খ’ (যেমন: ‘ক্ষমা’—খমা) এবং মাঝখানে বা শেষে থাকলে ‘ক-খ’ (যেমন: ‘লক্ষ্য’—লোকখো, ‘দক্ষ’—দোকখো) এর মতো হয়।
  • অন্যান্য কঠিন যুক্তবর্ণ: ‘হ্ম’ (হ+ম, উচ্চারণ হবে ম্ম, যেমন ‘ব্রহ্ম’—ব্রোম্মো), ‘হ্ব’ (হ+ব, উচ্চারণ হবে ওভ, যেমন ‘আহ্বান’—আওভান)। এই নিয়মগুলো শেখার জন্য প্রমিত বাংলা উচ্চারণের নির্ভরযোগ্য বই, যেমন—নরেন বিশ্বাসের গ্রন্থগুলো সংগ্রহে রাখা এবং নিয়মিত পড়া জরুরি।

 

৫. স্বরের স্কেল ও কণ্ঠের দৃঢ়তা (Firmness)

আপনার কন্ঠের সঠিক প্রয়োগ শুদ্ধ উচ্চারণকে আরও শ্রুতিমধুর করে তোলে। আগের পর্বে আলোচিত ‘গলার জোর’ বা দৃঢ়তা এই পর্বে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

  • স্কেল নির্বাচন (Scale Selection): খুব উঁচু স্কেলে (High Pitch) চিৎকার করলে কণ্ঠ কর্কশ ও শ্রুতিকটু শোনায়। আবার খুব নিচুতে (Low Pitch) বললে তা শোনায় মিনমিনে বা দুর্বল। আপনাকে আপনার স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরের (Natural Pitch) ঠিক মাঝামাঝি থেকে একটু গভীর স্বরে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। এতে কন্ঠের গাম্ভীর্য বাড়ে।

  • প্রক্ষেপণ (Projection): আপনার সামনে বসে থাকা প্রথম দর্শক এবং সবশেষে বসে থাকা দর্শক যেন সমানভাবে প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট শুনতে পায়—এমনভাবে শব্দ ছুঁড়তে হবে। চিৎকারের বদলে কন্ঠের পেশিকে ব্যবহার করে শব্দকে দূরে পাঠানোই হলো কন্ঠের প্রক্ষেপণ। এটি আয়ত্ত করতে প্রতিদিন খোলা জায়গায় বা বড় ঘরে আবৃত্তির অভ্যাস করুন।

 

৬. প্রাত্যহিক অনুশীলন: মুখের ব্যায়াম

উচ্চারণ স্পষ্ট এবং সাবলীল করতে জিহ্বা ও মুখের পেশিকে সচল রাখা প্রয়োজন। এই ব্যায়ামগুলো প্রতিদিন ১০ মিনিট করুন:

  • জিহ্বার ব্যায়াম (Tongue Exercise): জিহ্বা মুখ থেকে যতটা সম্ভব বের করে ডানে-বামে, এবং গোল করে ঘোরান। এরপর জিহ্বার ডগা দিয়ে ওপরের ও নিচের দাঁতের পাটি এবং তালু স্পর্শ করুন। এটি জিহ্বার আড়ষ্টতা বা জড়তা কমাবে।
  • দ্রুত পঠন (Tongue Twisters): কঠিন অনুচ্ছেদ বা টাং টুইস্টার দ্রুত পড়ার চেষ্টা করুন। যেমন: “পাখি পাকা পেঁপে খায়” বা “কাঁচায় কাঁচ ট টাকায় কাঁচ”। লক্ষ্য রাখবেন গতি বাড়লেও যেন উচ্চারণ অস্পষ্ট না হয়।
  • স্পর্শ বর্ণ চর্চা: ক, চ, ট, ত, প—এই বর্গীয় বর্ণগুলো জোরে জোরে স্পষ্ট করে উচ্চারণ করুন। এতে ঠোঁট এবং জিভের জড়তা দ্রুত কেটে যাবে।

 

৭. প্রমিত উচ্চারণের জন্য জরুরি টিপস

  • পাণ্ডুলিপি মার্কিং: আবৃত্তি করার আগে পাণ্ডুলিপিতে প্রতিটি কঠিন বা সন্দেহজনক শব্দের নিচে দাগ দিন এবং তার শুদ্ধ উচ্চারণ পাশে লিখে নিন।
  • অভিধান ব্যবহার: পড়ার সময় কোনো শব্দের উচ্চারণ নিয়ে দ্বিধা হলে সাথে সাথে প্রমিত বাংলা উচ্চারণের অভিধান ব্যবহার করুন।
  • রেকর্ডিং ও বিশ্লেষণ: নিজের আবৃত্তি নিজেই মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে শুনুন। লক্ষ্য করুন কোথায় আঞ্চলিক টান বা শব্দের বিকৃতি ঘটছে। নিজের ভুল নিজেই ধরতে পারা হলো সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

আপনার আবৃত্তির প্রতিটি শব্দ যদি মজবুত এবং সুগঠিত হয়, তবেই আপনার আবৃত্তির ইমারত দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং শ্রোতার মনে জায়গা করে নেবে। তাই আগে শব্দকে জয় করুন, তারপর ভাবের জগতে ডুব দিন।

পরের পর্ব দেখুন:

Leave a Comment